ভাল্লাগে না ভাই…

দিনকাল খুবই খারাপ যাচ্ছে। মাস তিনেক আগে আম্মুর অপারেশন হল, গত সোমবার বিকেলে পরীক্ষা শেষ করেই শুনি আব্বু হাসপাতালে। কি হইছে আমাকে কিছু বলতেছে না কেউ খালি বলে, আগে বাসায় আস, তারপরে বলতেছি। পরীক্ষার জন্য আমারে কেউ কিছু জানায় নি।

আল্লাহর অশেষ রহমতে আব্বু মোটামুটি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেন বৃহস্পতিবার রাতে। চেয়ার থেকে পড়ে মাথার পেছনে আঘাত পেয়েছিলেন। তবে সামান্য কাটা আর ব্লিডিং ছাড়া তেমন কোন খারাপ কিছু হয় নি। এক্সরে আর সিটি স্ক্যান রিপোর্ট বেশ ভাল। যদিও এখনো বেশ দুর্বল। তবে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।

এইসব শেষে IUT তে ফিরলাম শনিবার সন্ধ্যায়। আম্মুর কড়া হুকুম, দাড়ি রাখা চলবে না। বাধ্য হয়ে আমার সাধের দাড়ি ফেলে আবার হাফ লেডিস চেহারা নিয়ে রুমে ঢুকলাম। তখনো কেউ আসে নি। ইমন বাসায়, মহিব আর মুহাম্মদ চিটাগং। রুমের শোচনীয় অবস্থা ঝাড়ুটাড়ু মেরে কোনমতে বিছানাটাকে বাসযোগ্য করে পিসিটা অন করলাম।

বাহ… দারুণ তো, পিসিটাও গেছে। এই গিগাহার্টজ কোয়াড কোরের যুগে বুড়া পেন্টিয়াম ৩ , ৭৩৩ মেগাহার্টজ পিসিটা আমার আর কত দিনই বা টানবে। ব্যাপার নাহ, রুমে আরো তিনটা পিসি আছে, কোন ব্যাপার ই না। সিসিবিতে আসা আমার কে আটকাবে শুনি? কিন্তু কে যেন বলেছিল, পিসি নস্ট হইলে যত খারাপ লাগে, বউ বাপের বাড়িতে গেলেও এত খারাপ লাগে না। একটা গোসল দিয়া আইসা কেমতে কেমতে আমার বুড়া পিসিটাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনলাম। তবে বেচারার সিমোসের ব্যাটারী লো। পিসি অন করলে প্রতিবার টাইম ঠিক করতে হয়। এইডা কুনু ব্যাপার হইলো? আমি তো দিনে একবারই পিসি অন করুম। একটা ব্যাটারী কিনতে হইলে আবার সেই বোর্ডবাজারে গিয়ে ঘড়ির দুকানে যাও… উফ…. থাক ভাই… যেমনে আছে চলুক।

আমার পিসি অন হইতে প্রায় সাত আট মিনিটের মত লাগে। কিছুক্ষণ টাংকি মারলাম মুবাইলে। কাইল থেকে জিপির ২৫ পয়সা আর নাই। তাই যত পারি কইয়া নেই। সব মুবাইলে কলরেট কমে, জিপি বাড়ায়। বাহ বাহ। অবশ্য কলরেট যতই বাড়াক, আমার টাংকি মারার রেট কমার কোন আশা দেখছি না।

মহিব চলে আসছে। পিসিও অন হইছে। সিসিবিতে ঢুকলাম। থাকতে পারলাম না বেশিক্ষণ।

সব কিছু অসহ্য লাগতেছে। বাসায় ফোন দিয়ে আম্মুর সাথে কথা বলে মনটা হালকা হল। আইচ্ছা, বাবা মায়েরা এমন কেন হয়? বাবা মার সাথে থাকলে , কিছুক্ষণ গল্প করলে পৃথিবীর সব কিছুই ভাল লাগে। আব্বু-আম্মু দুজনেই কিছুদিনের ব্যবধানে হাসপাতালে থাকার সময় দুজনের সাথেই অনেক গল্প করা হয়েছে, যা হয়ত ক্যাডেট কলেজে যাবার পরে আর হয় নি। নাহ, বাপ-মা রা আসলেই বস। আইচ্ছা, আম্রা যখন বাপ-মা হমু, তখন কি আমরাও এই রকম বস হইতে পারুম?

কোন কাজ নাই, কি করা যায়? পুরা ব্লকে আমি, মহিব আর মন ছাড়া কেউ নাই। মন, বেচারা সকাল থেকে কিছু করার না পেয়ে রাগের চোটে ডিএসপি পড়তেছে। কয়েক দফা গাইলাইলাম অরে রুমে গিয়া। হালায় কয়, লাস্ট পরীক্ষা বইলা খুশিতে না পইড়া পরীক্ষা দিছি, তাই এখন পড়তেছি :D:D:D

আমি আবার টাংকি মারতে বসলাম।

ভোরে ঘুমুলাম। সকালে আবার ফোন,
– অই মনপুরা দেখবি?
– না রে ভাই, ক্লাস আছে। (কে যায় সাধের ঘুম ফালাইয়া মনপুরা দেখতে!)
– আমি কিছু জানি না, তুই এক্ষুণি আয়।
আর ঘুম আসল না। সব ফেলে ছুটে গেলাম। দেখেও এলাম। বেশ ভালই। মুভিবোদ্ধাদের চরম অপছন্দের কমার্শিয়াল ছবিটি আমার খুব একটা খারাপ লাগল না।

বিকেলের একটা ঘটনায় মনটা ভার হয়ে আছে।
বেইলী রোডে খাওয়া শেষে রিকশা নেব। এমন সময় এক বৃদ্ধ আমার সামনে এসে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, বাবা.. বাবা…
আমি বললাম, কি হইছে চাচা, কাঁদেন ক্যান?
শ্লেষ্মাজড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন, বাবা, বুড়া বইলা আমার রিকশায় কেউ উঠে না বাবা। সকাল থিকা মাত্র পাঁচ ট্যাকা পাইছি বাবা। আমার রিকশায় একটু উঠেন বাবা… বলেই উনি আমার হাত ধরে আবার কাঁদতে শুরু করলেন।
এসব ক্ষেত্রে আমি নিজেও ইমোশনাল হয়ে পড়ি। উনি তো আর ভিক্ষা চাচ্ছেন না। খেটে পয়সা নিবেন। রিকশায় উঠেই পড়েছিলাম প্রায় উনার। এমন সময় কোন একটা দোকানের দারোয়ান, কয়েকজন রিকশাওয়ালা আর পথচারী আমাকে ডেকে বললেন, এই যে ভাই, উনার রিকশায় উইঠেন না। আমি অবাক হয়ে বললাম, ক্যানো কি হইছে? (মানবতা বলে কিছু নাই আপনাদের… টাইপ ঝাড়ি দেবার প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম মনে মনে)

সবাই যা বলল তার সারমর্ম হল, চাচার রিকশায় উঠে কিছুদূর যাবার পরেই চাচা বুকে ব্যথার কথা বলে রাস্তায় শুয়ে পড়বে। তারপর সেন্সলেস হবার ভান করে আপনাকে আরো ঝামেলায় ফেলে আপনার কাছ থেকে আরো টাকা নিবে।
বৃদ্ধ চিৎকার করে কেঁদে বললেন, মিছা কতা বাবা। বিশ্বাস করেন, একবার সত্যি সত্যিই আমি পইড়া গেছিলাম, এরপর থিকা কেউ আমার কথা বিশ্বাস করে না বাবা… বৃদ্ধ রাস্তায় বসে পড়ে কাঁদতে লাগলেন।

এরপরের ঘটনা আমার আর লিখতে ইচ্ছা করতেছে না। কোন কাজেই শান্তি পাচ্ছি না। বার বার মনে হচ্ছে এভাবে ফিরে না এলেও পারতাম।

বাসে করে আসার সময় আবার নিজের বাড়ি সিসিবিতে ঢুকলাম, কয়েকটা কমেন্ট পড়ে মনটা খুব খারাপ হল। ফয়েজ ভাই, সত্যিই কইতেছি, আমার ম্যাচুরিটি এখনো আসে নাই। আমার ধর্ম নিয়া কেউ খুঁচা দিলে পাল্টা খুঁচা না দিয়া থাকতে পারি না। রবিন ভাই, নিজের বাড়িটা ছাইড়া শহীদ হইতে চাই না ভাই, একটুও না। কি করি ভাই কনতো?

আমার খুব প্রিয় দুইটা বন্ধুর উদ্দেশ্যে কিছু অপ্রিয় কথা বলে শেষ করিঃ
দোস্তরা, মৃত্যুর পর পরকাল বলে যদি কিছু থেকে থাকে ( না থাকলে তো কোন সমস্যাই নেই ), তখন যখন সৃষ্টিকর্তা আমাকে প্রশ্ন করবেন “তোমার বন্ধু যে ভুল পথে পা বাড়াল, তুমি তাকে থামালে না কেন? কেমন বন্ধু তুমি?” তখন সৃষ্টিকর্তার সামনে আমাকে যাতে চুপ করে মাথা নিচু করে না থাকতে হয়। তখন অন্তত সৃষ্টিকর্তার সামনে মুখ ফুটে বলিস যে, (যদিও তিনি অন্তর্যামী, তবু বলিস) “ও আমাকে ফেরাতে চেয়েছিল।”

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s