ইনসমনিয়া, ফ্রয়েডীয়তা, কালবেলা , পাভলভ এবং অনেকদিন পর একটা গদ্য | অমিত চক্রবর্তী

ইনসমনিয়া, ফ্রয়েডীয়তা, কালবেলা , পাভলভ এবং অনেকদিন পর একটা গদ্য

০১

ইনসমনিয়া! আমার কলেজে সেকেণ্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হতো সেকেণ্ড হাফে মানে দুপুর ১ টায়।সেই কলেজ সেকেণ্ড ইয়ার থেকেই ইনসমনিয়া নিত্যসঙ্গী।রাত না কাটলে ঘুমাতে খুব মায়া লাগে।মনে হয় কি জানি মিস হয়ে গেল।কি জানি দেখা হলো না।এই মায়াসংক্রান্তু কারণেই আর ঘুমানো হয় না।রাতে আমি আমার ঘরে প্রায়শই একটা পায়ের আওয়াজ শুনি।তবে কোনোদিন ঘাবড়াই নাই।কারণ ঐ ব্যক্তি আমার পরিচিত, জনাব ফ্রয়েড। রাত জাগা মানেই ফ্রয়েড সাহেব কিছুসময় পায়চারি করে জানায়া দ্যান যে উনি বহাল তবিয়তেই আছেন।মূলত ১২ টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত ১০ টা বেনসন, গোটা ত্রিশেক গান আর এই বর্গাকার সতেরো ইঞ্চি মনিটর- এইগুলোই আমার রাত্রিজাগরনের রসদ।রাতে যে জিনিসটা নিয়ে ইদানীং খুব চিন্তা করি সেটা হলো জ্যোৎস্না ও যৌনতার সম্পর্ক।কখনো মনে হয় জ্যোৎস্না আসলে একটা পিস্তল যার ভেতরে যৌনতা নামক কার্তুজ ভরা থাকে।যৌনতাকে একটা কামরা বলেও ভ্রম হয় যার ভেতর একমাত্র কিছু অনধিকার চর্চাকারী ট্রেসপাসিং জ্যোৎস্নারই ঢুকার সাহস আছে।এইসবই আসলে ফ্যান্টাসী তবুও ভালো লাগে এইগুলা।

রাত আছে বলেই বেঁচে থাকার কিছু তাৎপর্য আছে-অন্তত আমার কাছে।

০২

আমার ঘরের জানলা বরাবর একটা রেমব্রান্ট আছে।অবশ্যই কপি করা জিনিস এবং অবশ্যই এটা আত্মপ্রতিকৃতি।বাবা সিংগাপুর থেকে কিনেছিলেন আমার রিকোয়েস্টে।রাতের যে গতি আছে এই ছবি থেকে আমি খুব বুঝতে পারি।রাতের নিজস্ব প্যাটার্নগুলো, ফ্লোগুলো এই ছবিতে ধরার চেষ্টা করি।মাঝে মাঝে এইসব কোনেক কবিতায় এইভাবে ঢুকে যায় – “দেয়ালচিত্রের ভেতর অনর্গল ভেসে যায় আমাদের প্রমিত
রাতের স্রোত”।কবিতা লিখাও তো এক একসময় ব্লাসফেমি হয়ে যায়।কারণ কবিরা যেহাতে কবিতা লেখে, সেইহাতেই তো স্বমেহন করে।চুড়ান্তবিচারে অবশ্য জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা একটা ব্লাসফেমিই যাপন করি।হু কেয়ারস!

এই অনুচ্ছেদটা কবি আন্দালীবের একটা ইনসমনিয়া বিষয়ক অসাধারণ পঙ্কতি দিয়ে শেষ করতে চাচ্ছি।

০২:৩৭
অসফল সঙ্গমের শোক বুকে চেপে ঘুমিয়ে পড়েছে যারা
অনিদ্রারোগীর আকুলতা এর চেয়ে তো বেশী কিছু আর নয়!
ফ্রিজিয়াম! ওহ ফ্রিজিয়াম!
মরফিয়াসের চোখের গভীরে দেখি নিস্তরঙ্গ আমার শহরখানি ডুবে যায়‍!

( মধ্যযাম থেকে কয়েকছত্র-আন্দালীব)

যখন এইরকম কোন পঙ্কতির মুখোমুখি হই তখন মনে হয় যে কবিতার মধ্যেও আমাদের এই যাপনের নিগুঢ কোন সত্য লুকিয়ে থাকে।কবিতা একসময় ব্লাসফেমি ও অন্যান্য ক্লীবতা অতিক্রম করে।কবিতা একসময় সত্যিকার শৈলী হয়ে উঠে।

০৩

সম্প্রতি আবার কালবেলা পড়া হয়েছিলো। কালবেলা পড়তে পড়তে সমরেশের উপর খুব বিরক্ত হয়ে গেলাম হঠাৎ। হঠাৎ মনে হল শরৎচর্চা করতে করতে এই যে এক মাধবীলতা’কে তিনি সৃষ্টি করলেন, তিনি কি একবার ভাবেননি ঘাম-কাম-লোভ-কাদায় গড়া মানুষ একসময় এই মাধবীলতাকে প্রত্যাখান করবে।মানুষ নিজে যা হতে পারেনা তাকে সবসময়ই প্রত্যাখ্যান করে।আমি কিশোরকালে পাঠের সময় যে বারবার মাধবীলতাকে মনে মনে আঁকতাম, যার ছবিগুলোতে শেষ পর্যন্ত শুভ্রতা ছাড়া আর কিছু দেখা যেত না, মাধবীলতাকে প্রত্যাখান করেছি বহুআগেই, যদিও আমার বোধ এসেছে এইমাত্র।মাধবীলতাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে সারারাতে তিনটা লাইন লিখা হয়েছিল।

“মাধবীলতা,
বিশ্বাস কর একসময় আমরাও প্রেমিক ছিলাম
মনেপ্রাণে মানতাম গার্লফ্রেণ্ডদের ব্লাউজের নিচে
স্তন নয় একটা আস্ত হৃদয় লুকিয়ে আছে।”

সবকিছুর পরও,আমি মনে মনে সমরেশকে একটা ধন্যবাদ জানাই।

০৪

কারওয়ান বাজার আন্ডারগ্রাউণ্ড প্যাসেজে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেদিন।সকালবেলা আমার তেমন কোন তাড়া ছিলো না।এই অকাটমূর্খের মতো দাঁড়িয়ে থাকার জন্যই বোধহয় দেখলাম কয়েকজন আমার দিকে বেশ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেল।কয়েকজন তরুণ রীতিমত ধাক্কা মেরে চলে গেল।আমি দেখলাম টানেলের সামনে যে শহরটা আড়মোড়া ভাঙছে সে অশ্লীল রকমের ব্যস্ত, কামান্ধ হাতের মতো। তার যৌনোত্তেজিত শহরের জিহবায় সেইসব তরুণেরা অনায়াসে চলে যাচ্ছে।
এই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে আমায় এক অদ্ভূত জড়তা আক্রমন করে।
আমি আর কিছুতেই নড়তে পারি না।

মাঝে মাঝে এই রকম কোন মুহূর্তে ঋতিহীনতা আশির্বাদ হয়ে দেখা দেয়।

০৫

আমার টেবিলের সামনে একটা টুলে পাভলভ বসে আছে।আমি খুব হিংসুটে দৃষ্টিতে পাভলভের দিকে তাকিয়ে থাকি।এক সময় খুব সন্দেহে থাকতাম যে কে মাকে বেশি ভালোবাসে? আমি না পাভলভ? আমি না গোর্কী? এখন এইসব আর ভাবি না। এখন ভাবি পাভলভ কি খবরের কাগজ পড়ে? সে যখন দেখে মায়েরা কামোন্মত্ততার কারণে সন্তানদের হত্যা করে ফেলছে তখন তার চোখে কি কোন ছায়ার জন্ম হয়?

পাভলভ, বিশ্বাস কর আর নাই কর
মায়েরা এখন শিশুহত্যা শিখে ফেলেছে
বেসিনে সন্তানের রক্তের দাগ রেখে
তারা নিষ্ঠুর কায়দায় বিছানাময়ী হয়ে উঠতে শিখে ফেলেছে।

০৬

লিংকিন পার্কের একটা ভিডিও দেখে গতরাতে চমকে উঠেছিলাম।সেই ভিডিওতে দেখাচ্ছিল, এক ককেশিয়ান তরুণী ডায়েট মেইনটেইন করে কোমরের মাপ নিয়ে দেখছে সে কতোটুকু স্লিম হয়েছে, পরবর্তী চিত্রে দেখালো এক আফ্রিকান বৃদ্ধকে অনাহারে যার পাঁজরের হাড় দৃশ্যমান।
কি অদ্ভুত রিকারেন্স!

এই দুটি দৃশ্য রেটিনায় লেগে আছে।তবে ব্যপার না।জ্ঞান হবার পর থেকেই আমি একটা জিনিস শিখেছি।সেটা হলো ইম্প্রোভাইজেশান। আস্তে আস্তে এই দৃশ্যকে আমি ইম্প্রোভাইজ করে ফেলব কোন সুন্দর দৃশ্যে।

এটা দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

০৭

লোর্কার একটা কবিতা নিয়ে প্রতিরাতে বসি। “ব্যালাড অব দ্য স্প্যানিশ সিভিলগার্ড”। প্রতিদিন ভাবি এটাকে নিজের মতো করে লিখব।পারি না।
রাতগুলো দীর্ঘ হতে থাকে আর দেখি হঠাৎ আমি সেই বধ্যভূমিতে এসে গেছি।আমার সামনে চোখ বাঁধা লোর্কা।হননকর্মীরা, ওরা চূড়ান্তপর্যায়ে প্রস্তুত।তার মৃত্যদৃশ্যটির অবতারণা হওয়ার আগেই আমি পালিয়ে চলে আসি।

আমার শিরার ভেতর একটা টিকটিকি লুকিয়ে আছে।যতো চেষ্টাই করি না কেন সময়মতো এটা ঠিকই নিজের চেহারা বের করে ফেলে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s