গল্পঃ মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট

​পায়ের নখ কাঁটা দরকার । বাড়তি নখের জন্য সু পড়া যাচ্ছে না । গুহা মানবদের মতো নখ বেড়ে উঠায় মোজো পায়ে গলাতেই কেমন বাঁধো বাঁধো ঠেকছে ।
– মা নেইলকাটার কোথায় ?
– তোর বাবার ড্রয়ারে দেখ তো , কাল রাতে ওইখানে দেখেছিলাম । মা রান্না ঘর থেকে জবাব দেন ।

নেইলকাঁটার বাবার ড্রয়ারেই পাওয়া গেল । বাবার ঘুম না ভাঙিয়ে খুব ধীরে ধীরে নেইলকাঁটার নিয়ে চলে আসতে চাইলেও সম্ভব হল না ।
–খোকা !
ইশশ , শব্দ হয়ে গেছে ! বাবার তীব্র ইনসমনিয়া । তিনি সারা রাত জেগে থাকেন । হয়তো বই পড়েন , লেখালেখি করেন ,গুনগুন গান ধরেন অথবা একদম চুপচাপ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন । ভোরের দিকে বিছানায় যান । একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠেন । এমনটাই হয়ে আসচ্ছে দীর্ঘদিন । শব্দ করে আজ বাবার সকাল সকাল ঘুমটা ভেঙ্গে দিলাম ।

–আপনার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম বাবা ! আমি নতমুখে বললাম
–আরে না রে ! চোখ কি আর এখন এতো সহজেই জোড়া লাগে যে ঘুম ভাঙবে । শীতের মিষ্টি রোদটা জানালা গলে বেশ কিছুক্ষন যাবত গালে এসে পড়ছে । রোদটা গালে পুষে রাখছি । ভালো লাগছে , জানিস !
–বারান্দায় বসবেন ?
বাবা উজ্জ্বল মুখে বলে উঠলেন – সেই সাথে এককাপ গরমাগরম চা ! আহা ! হুইল চেয়ারটা দে তো খোকা ।

আলমারির সাথে ঠেস দিয়ে রাখা হুইল চেয়ারটা বিছানার কাছে নিয়ে আসলাম । বাবা আমার দু কাঁধে ভঁর দিয়ে ধীরে ধীরে চেয়ারে বসলেন । নিজেই চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বারান্দায় গেলেন । আমি যাচ্ছি বাবার পিছন পিছন ।

বাবা মোটেও চান না তাঁর হুইল চেয়ার পিছন থেকে অন্য কেউ ঠেলে নিয়ে যাক । সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসচ্ছি । দীর্ঘদিন পোষ্ট অফিস মাস্টার হিসেবে চাকুরী করেছেন । কিন্তু কক্ষনো শুনিনি কাউকে বলেছেন – “ আমাকে বাড়ি পৌঁছে দাও । “
দু পা হারাবার পর নিজের হুইল চেয়ারের চাকা তিনি নিজেই ঘুরিয়ে পথ চলেছেন । সুদীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর । ক্লান্তিহীন । কিন্তু আজ লক্ষ্য করলাম শোবার ঘর থেকে বারান্দা এইটুকু পথ চলতেই বাবা বড্ড হাপিয়ে গেলেন ।

–আমাদের মাস্টারনী কি চলে গেল ? ডান চোখে সরু করে অল্প কৌতুকের আদলে বাবা কথাটি বললেন ।
আমি হেসে জবাব দিলাম ।
– মা রান্নাঘরে । আজ উনার বেশ তাড়াহুড়ো । স্কুলে আজ থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে । এক্সাম হলে মা’র ডিউটি পড়েছে ।
–গেল ! তাহলে তো আর চা’য়ের কথা মাস্টারনীর কানে তোলা যাবে না । ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করে দিবেন ।

এখনো বাবার চোখে মুখে কৌতুক । বাবাকে আমি কখনো কৌতুক মেশানো ভঙ্গি ছাড়া মা প্রসঙ্গে কথা বলতে দেখিনি ।
বাবা মিটিমিটি হাসচ্ছেন । মিষ্টি রোদটাও এখন বাবার কোলে । রোদটাও মিটিমিটি হাসচ্ছে ! একটা ক্যামেরা যদি থাকতো ছবি তুলে রাখতাম ! কি সুন্দর লাগছে বাবাকে ।

আমি রান্নাঘরের চৌকাঠে দাড়াতেই মা কপট বিরক্তিতে আমার হাতে চায়ের চাপ তুলে দিলেন ।
–তাড়াতাড়ি যা ! উনাকে দিয়ে আয় । তোদের গলার আওয়াজ শুনেই বুঝেছি সে উঠে পড়েছে । এখন এক কাপ চা না পেলে তো চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিবে ! খুব যন্ত্রণা দেয় বুড়োটা ।
আমি চায়ের কাপ হাতে নিলাম । গত ছাব্বিশ বছরে আমি এই দুই তুমুল প্রেমময়ী নরনারীর তীব্র ভালোবাসা বুঝতে শিখে গিয়েছি । এবং বিস্মিত হয়েছি বাবা মা’র পরস্পরের প্রতি ভালবাসতে পারার ক্ষমতা দেখে ।

বাবার হাতে চায়ের তুলে তুলে দিয়ে আমি রুমে আসলাম । ১১ টায় আমার ইন্টার্ভিউ । একটু আগেভাগেই অফিসে পৌছাতে চাই । দেরীতে রওনা দেয়ার কারনে এরআগে বেশ কয়েকটা ইন্টার্ভিউ মিস হয়েছে । এখন থেকে আর দেরী নয় ।

পায়ের নখ দ্রুত কেটে বাথরুমে ঢুকে গেলাম । গোসল দিলাম । বের হয়ে ফিটফাট বাবু সাজলাম । চাকুরীর ইন্টার্ভিউ অনেকটা কন্যা দেখার মতো । চাকুরী প্রত্যাশী মানুষটি এখানে কন্যা আর চাকুরীদাতা খুঁতখুঁতে পাত্রের মা , বোন অথবা বড় খালা ! এ এক কঠিন পরিস্থিতি ! ছেলে মেয়ে প্রায় সবাইকে এই ভয়ঙ্কর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় । তারপরও কেন যেনো সমাজ থেকে কন্যা দেখা প্রথা বিলোপ হয় না ! চাকুরীর ক্ষেত্রে না । মেয়েদের ক্ষেত্রেও না ।

এজুকেশন সার্টিফিকেট ফাইলটা অভ্যাসমতো দেখে নিলাম । যদিও জানি দেখার কিছু নেই । এই পর্যন্ত বহুবার ঠিক এইভাবেই ফিটফাট বাবু সেজে ফাইল চেক করেছি । কাগজপত্র যার যেখানে থাকার সেখানেই আছে কিন্তু চাকুরী নামের সোনার হরিণ আজ পর্যন্ত হাতে ধরা দেয়নি । তাই বলে ইন্টার্ভিউ দেয়া বন্ধ থাকছে না । দিয়ে যাচ্ছি । একদিন হয়তো পেয়ে যাবো সেই অমূল্য রতন ।

সব গোছগাছ করে যখন রুম থেকে বের হয়ে আসলাম শুনি বাবা গুনগুন করে গান গাইছে । মা ইতিমধ্যে চুপিচুপি দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন । আমি মা’র পাশে দাড়াতেই আমার কাঁধে মা মাথা রাখলো । আমরা মুগ্ধ হয়ে বাবার গান শুনছি –

“ আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা // কারোর দানে পাওয়া নয়

চমৎকার ভরাট গলায় গান করেন বাবা ! বিয়াল্লিশ বছর আগে একুশ বছরের টগবগে এই তরুণ স্টেনগান হাতে দেশ স্বাধীন করেছিল । আর কণ্ঠে ছিল গান । যেদিন ভোরে বাবা তার দুটো পা হারায় তারআগের মধ্যরাতেও তিনি তাঁর সঙ্গীদের শুনিয়েছিলেন – “ মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি // মোরা একটি ফুলের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি “
স্মৃতির সিন্ধুক থেকে বহুবার আমাকে সেদিনগুলোর গল্প তিনি শুনিয়েছেন ।

গুনগুন গান শেষ হবার পর আমি বাবার কাছে এগিয়ে গেলাম ।
–বাবা , আমি বের হচ্ছি
–কোথায় যাচ্ছিস রে ?
–একটা ইন্টার্ভিউ আছে বাবা !
ঘাড় ঈষৎ বাঁকা করে বাবা আমায় দেখতে দেখতে বললেন–চাকুরীর বাজারটা বড় কঠিন হয়ে যাচ্ছে তাই না খোকা , খুব অবাক লাগে এতো ভালো রেজাল্ট নিয়েও চাকুরীর হচ্ছে না দেশে ! চাকুরী গুলো পায় তবে কারা ।
মা বাবার দিকে আজকের পত্রিকা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল
–যারা চাকুরিদাতাদের পকেট ভরে দিতে পারে , মামা চাচার ক্ষমতার দাপট দেখাতে পারে অথবা সঠিক সময়ে সার্টিফিকেট ব্যবহার করতে পারে চাকুরী তাদের হয় ।

সার্টিফিকেটের কথা শুনে বাবা হাসতে লাগলেন । এইটা বাবার প্রতি মায়ের খুব কমন একটা অভিযোগ । তিনি প্রায়শই বলেন আজও বললেন
–আমাদের তো মামা চাচা দাপট নেই কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে সার্টিফিকেট তোমার আছে সেটা তো তুমি কোন দিন আমাদের ব্যাবহার করতে দিলে না ।
বাবা পত্রিকা এক হাত হতে অন্য হাতে নিলেন । উনার মুখ কিছুটা অন্যমনস্ক । কিছু ভেবে বলবার আগে বাবার এমনটা হয়

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s