মৃত্যুচিন্তা

FEB9343C7D2E7B91825EC74F56AF4BB1

পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ বোধহয় মানুষকে সান্ত্বনা দেয়া। কারও বিপদে পাশে থাকা এক জিনিস, আর সান্ত্বনা দেয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।
কারো কোন জিনিস হারানো গেলে, কিংবা পরীক্ষায় খারাপ করলে কিংবা অন্য কোন লস হলে, ব্যাপার নাহ দোস্ত, নেক্সট টাইম! বলা যায়, কিন্তু সান্ত্বনা কিভাবে দেয়?
চার বছরের আইইউটি লাইফের বন্ধু অনিকের আব্বা স্ট্রোক করেছেন, এখনো রিকভার করেন নি, সুস্থ হতে সময় লাগবে। একটা ফোন করারও সাহস পাই নি। কি বলব ফোন করে? সান্ত্বনা কেমনে দেয়? দিয়ে কোন লাভ আছে? দেশ থেকে ঘুরে যাবার মাস খানেকের মাথায় এই ঘটনা, বিদেশে থাকা যে কোন মানুষের worst nightmare হইলো বাবা মার কিছু হওয়া। সেইটাই ও ফেস করতেছে। পড়তেছে কেমনে? ক্লাস করতেছে কেমনে? জানি না। জিগানো সম্ভব না। কেমনে জিগাই?

আমার ছয় বছরের ক্যাডেট লাইফের বন্ধু ইসলামের বাবা মারা গেলেন, আইইউটি থেকে সবাই গেল উনার জানাজায়। আমি যাই নি। ইচ্ছা করেই যাই নি। দুইটা কারণে।
এক. গিয়ে কি বলব ইসলামকে? সান্ত্বনা দিব কি বলে? ব্যাপার নাহ দোস্ত নেক্সট টাইম?
দুই. কলেজে ইসলামের কাছে প্রায়ই ওর আব্বার গল্প শুনতাম। যতবার ময়মনসিংহ গিয়েছি ততবারই ইসলামদের বাসায় গিয়েছি, প্রতিবারেই আংকেলের সাথে দেখা হয়েছে, আন্টির সাথে দেখা হয়েছে। উনারা দুইজনেই অত্যন্ত হাসিখুশি প্রাণখোলা মানুষ, সারাক্ষণ মাতিয়ে রেখেছেন।  সেই হাসিখুশি মানুষটার নাকে তুলো গোঁজা নিথর মুখের ছবিটুকু আমার মনে গেঁথে যাক সেটা চাই নি। তাই আমার কাছে এখনো ইসলামের আব্বা মানেই একজন হাসিখুশি প্রাণখোলা জলি মানুষ, যিনি চিরকাল সেভাবেই থাকবেন।

আমাদের আইইউটির বন্ধু সারিক, জাফলঙে বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গেল। ওর বাবা মা যেদিন আইইউটিতে আসলেন ওর আইইউটির হল থেকে ওর জিনিসপত্র নিয়ে যেতে, অনেকে গিয়েছিল দেখা করতে। আমি যাই নি। কি বলব গিয়ে? দূর থেকে শুধু দেখেছিলাম। ক্যাডেট কলেজের বন্ধু রেজা, সে ও মারা গেল পানিতে ডুবে এসএসসির ছুটিতে। ওর কবরের কাছেও যাই নি। সেইম রিজন!

আমি জানি ব্যাপারগুলি খুবই খারাপ হচ্ছে। আজকে যদি আমি জীবিত না থাকতাম, তখন যদি আমার বাবা মার কাছে যদি আমার বন্ধুরা না যেত, তাহলে কি আমার খারাপ লাগত না? জানি না। মানুষ নিজের বেলায় খুবই স্বার্থপর। আমি নিজেও।

মৃত্যু? মৃত্যু এমন এক জিনিস যার হাত থেকে কোন নিস্তার নেই। জগতের সবচেয়ে বড় এই সত্যটিকেই আমরা প্রতিনিয়ত এড়িয়ে যাই, কিন্তু প্রায়শই সে আমাদের অনেকের সামনেই এসে হাজির হয়। আবার পাশ কাটিয়ে যায়। আমরাও তাকে দেখেও না দেখার ভান করি, ভুলে থাকতে চাই। মাঝে মাঝে তবুও সে আমাদেরকে জানান দিয়ে যায় তার অস্তিত্ব।

গতকাল সাইফুল ভাই বলতেছিলেন, প্রতিদিন কতশত মৃত্যুর খবর শুনি আমরা, সব গা সয়ে গেছে। চোখের সামনে কারো মৃত্যু না দেখলে আমাদের টনক নড়ে না। বাকী ভাই নামে স্টকহোমে একভাই ছিলেন, ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলেন। উনার মৃত্যুটা স্টকহোমের বাঙালি সবাইকেই নাড়া দিয়ে গেছে। যদিও উনার সাথে আমার পরিচয় হয় নি কখনোই।

ছোটবেলায় দেখা বাংলা ছবিতে মৃত্যু মানে ছিল বিকট এক চিৎকার দিয়ে নিথর হয়ে যাওয়া। একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা অনেক ইজি, আমরা যতই বইতে পড়ি যে মৃত্যুযন্ত্রণা হচ্ছে সবচেয়ে কষ্টের, কিন্তু তবুও মন মানতে চায় না, মনে হয় আসলেই তো, মরার টাইম হলে বিকট এক চিৎকার দিয়ে স্থির হয়ে যাব। এই ভুল ধারণাটা ভেঙে গেল যখন চোখের সামনে নিজের ভাইয়ের মৃত্যু দেখলাম। নষ্ট কিডনি নিয়ে আবার বাঁচতে চেয়েছিল, শখ কত! তার চেয়ে মরে গিয়ে সবাইকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে। চোখ উল্টে, জিভ বের করে অনেক কষ্টে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার চেষ্টার সেই দৃশ্য, আর আশেপাশের সবার কান্নাভেজা কণ্ঠে সুরা ইয়াসিন আর কালেমার ধ্বনি … আর লিখতে পারতেছি না।

সেই ভয়েই দাদুর মৃত্যুর সময় আমি তার পাশে ছিলাম না। উনার মৃত্যুর আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে দূরে এক তালগাছের নিচে গিয়ে বসে ছিলাম। আর দাদী যেদিন মারা যান সেদিন আমি দাদুর বাড়ি যাবার বাসে উঠার জন্য সায়েদাবাদ যাবার চেষ্টায় বাড্ডা-রামপুরা এলাকায় ভয়াবহ জ্যামে বসেছিলাম পাঁচ ঘন্টা, দেখা পাই নি উনার। উনাদের কারো মৃত্যুই আরামদায়ক হয় নি। আমার নানার মৃত্যুও না। আমার নানা বেশ পরহেজগার মানুষ ছিলেন, উনার ওয়াজ এখনো আমাদের বাসায় বাজানো হয়, এবং সেই লেভেলের জোকার, তখন পিচ্চি ছিলাম বলে জোক্স বুঝতাম না যদিও।

বয়স হয়ে মারা যাবার চেয়ে একদিম দুম করে মরে গেলেই ভাল। ব্যাপারটা অনেক ইজি হবে সবার জন্যই। ক্লাস নাইন টেনে শামসুর রাহমানের লেখা একটি ফটোগ্রাফ কবিতাটা পড়ার সময় একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, মৃত মানুষের বয়স বাড়ে না। আমার দুই মামা আহমদ আলী আর মুছাব আলী মারা গিয়েছিলেন কিশোর বয়সেই একই বছরে, কলেরা আর বসন্তের এপিডেমিকে। আম্মা বা নানুর কাছে উনাদের বয়স কখনোই আর বাড়বে না। ১৯৮৮ সালের বন্যায় আমার খালাত বোন মনি আপা মারা গিয়েছিলেন আম্মুর কোলে। আজ হয়তো উনি বেঁচে থাকলে উনার বিয়ে হত, বাচ্চা হত, আমার ভাইগ্না ভাগ্নিদের লিস্টটা আরো বড় হত। উনার কোন স্মৃতি নেই আমার। উনার বয়স আর বাড়ে নি। আমার কাছে মনি আপা মানে একটা চার বছর বছরের কিউট একটা বাচ্চা মেয়ের সাদা কালো ছবি, যার চুলে শিং টাইপ ঝুঁটি করা।

family (5)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s