ঝিঁঝিঁ পুখা (একটি উত্তরাধুনিক প্রয়াস)

আমি রিক্সা থেকে নামলাম । বললাম
– ভাড়া কত হইসেরে তোর ?
রিক্সাওয়ালা আমার বাপের বয়সী হবে । তাকে তুই করে বলা ঠিক হচ্ছে না । যেকারণেই তাকে তুই করে বলে আমি একটা আনন্দ পেলাম । সে গম্ভীর গলায় বলল
– তিরিশ টাকা …
– কস কি রে ? এত টাকা কেমনে হইল ?
রিক্সাচালক স্থির চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল । তারপর এগিয়ে এসে শব্দ করে আমার গায়ে থুথু ফেলল । আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম । কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম
– কি করলেন এইটা ?
সে কোন জবাব দিল না । নির্বিকার মুখে রিক্সা ঘুরিয়ে চলে গেল । আমিও উল্টো দিকে ঘুরে হাটা দিলাম । একজীবনে কত লোকই তো গায়ে থুথু দিয়ে গেল । সেই তালিকায় একজন রিক্সাওয়ালার যুক্ত হওয়াটা সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু না ।
আমি হাটতেসি । অঘ্রাণ মসের রাত্রি । শীত শীত ভাব আছে একটা । আমার আবার একটু শীত বেশি লাগে , তাই গায়ে একটা বাদামী চাদর জড়ায়ে রাখসি । আমি হাতে ধরা গাজার স্টিকে টান দিলাম । ইদানীং আমি আমার ঘরের মধ্যেই গাঁজার চাষ করছি । সেদিন ইউটিউবের একটা ভিডিও দেখে শিখলাম । সেরকম কঠিন কিছু না । আমার হাতে আবার গাছপালা ভাল হয় । এখন আমার গাঁজার সাপ্লাই তাই অফুরন্ত । লোকজন পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সরু চোখে তাকাচ্ছে । পুরিয়ার ভিত্রে থাকা জিনিষটা ভাল বলে তার গন্ধও উৎকট ।

কিছুক্ষণ হাটার পরেই out of nowhere একটা লোক বাইরিয়া আসল । ড্রাইভার টাইপের চেহারা । বেটেখাটো , গোলগাল আর মাথায় টাক । বয়স পয়তাল্লিশের উপ্রে হবে । সে হাসিহাসি মুখে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল
– ছোটমামা না ?
– কে আপনার ছোটমামা ? আপনাকে তো চিনিই না … রাস্তা ছাড়েন মিয়া …
লোকটা রাস্তা ছাড়ল না । বরন্চ এগিয়ে এসে আমার হাত চেপে ধরল । যে হাত চেপে ধরল সেই হাতে আমার স্টিক ধরা । তিনি গলায় মধু ঢেলে বললেন
– ছোট মামা গাঁজা খাচ্ছেন নাকী ?
যেন গাঁজা খাওয়াটা কোন মহান কাজ । আমি নিশ্চিত ভাবে বুঝলাম ইনি ছিনতাইকারী । ছিনতাইকরী ছাড়া আর কেউ এই শহরে এত মধুমাখা গলায় আলাপ করে না । আমি আমার পকেটে হাত ঢুকালাম । আমার পকেটে সবসময়ই একটা চাকু থাকে । বোতাম টিপ দিলে ব্লেড বের হওয়া ছুড়ি । আমি ফট করেই ছুড়ি বের করলাম । সোডিয়ামের আলোতে ব্লেড ঝিলিক দিয়ে উঠল । লোকটা আমার হাত ছেড়ে লাফ দিয়ে সরে গেল । আমি গলায় হিসহিসে ভাব এনে বললাম
– কাছে আইবি না । একদম ফুটা করে ফেলব …
লোকটার চোখে স্পষ্ট ভয় । সে করুণ গলায় বলল
– ছোটমামা , এমন করতেসেন কেন ? আপনার কি পুরাই ইয়ে গেছে ?
– চুপ !!
তারপর আমি দেখলাম লোকটা নাই । শুন্য থেকে আসা মানুষ শুন্যেই মিলিয়ে গেল । আমি একা একা রাস্তায় দাড়িয়ে আছি ছুড়ি হাতে । পান্জাবি পরা এক বৃদ্ধ আমার এই ছুড়ি-হাতে মুর্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলেন । উনার ভয় দেখে আমার নেশা বেড়ে গেল । আমি মনে হল আজকে রাতে একটা খুন করলে কেমন হয় ? করা যায় । না করলেও সেরকম যায় আসে না ।

আমি গুনগুন করে গান গেতে গেতে রাস্তার উল্টা পাশে চলে আসলাম । এদিকে অনেক ঝিঝি পোকা ডাকছে । এই জায়গাটা সেরকম নির্জন না । নির্জন জায়গা ছাড়া ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে না –এরকম একটা ধারণা ছিল আমার এতদিন । এখন দেখছি ধারণাটা সত্যি না । ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে আমার কানে তালা লেগে যাচ্ছে ।
ঝিইইইইইইইইইইইই….ঝিঝিঝিঝি…..ইইইইইইইইইইইইইই……ঝিঝিঝি…..
আমি চাপা গলায় বললাম , “চুপ কর শুয়োরের বাচ্চারা ….” । দেখলাম শব্দ কমেছে । একটু অবাক হলাম । আমার কথা সাধারণত কেউ শুনে না । ঝিঁঝিঁ পোকারা শুনেছে , আল্লাহ ওদের ভাল করুক ।
কে যেন কাশল । অসোয়াস্তি নিয়ে কাশলে যেমন হয় । আমি তাকালাম । আবার ঐ লোকটা । সে করুণ গলায় বলল
– ছোটমামা …
– আবার আইসস তুই ? আমারে ফলো করতেসেন নাকী আপনি ?
– ছোটমামা একটু থাকি আপনের সাথে ?
– অফকোর্স না । তুই যা , নইলে কিন্তু খবর আছে কইলাম ।
– দুইটা কথা বলে চলে যাব । আপনের সমস্যা হইতেসিল দেখে ঝিঝি পুখাদেরকে থামায়ে দিলাম , তারপরেও কি বসতে দিবেন না ?
– আপনেই ঝিঝিগুলারে চুপ করাইসেন ? …হুমমমম , তাইলে বসেন ।
তিনি হাসি মুখে বসলেন । আমি বললাম
– আপনার পরিচয় কি ? অল্প কথায় বলবেন
– আমি দয়াল গুরু …
– মানে ?
– মানে ব্যাখ্যা করতে বসলে তো আপনার এই বালছাল গল্পটা উপন্যাস হয়ে যাবে …।
আমি বললাম , “ ও আচ্ছা …” । বালছাল গল্পের অপমানটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে । কিন্তু কি আর করা । আমি চুপ করে থাকলাম । দয়াল গুরু নিজে কোন কথা না বললে আমিও কোন কথা বলব না ঠিক করলাম । তিনি নিজেই বললেন
– আপনার কাছে আসার একটা করণ আছে …..
– কি করণ ?
– আপনাকে দেখেই মনে হল কোন এককালে আপনি জিরাফ পুষতেন
– হোয়াট ? এর মাঝে জিরাফ আনলেন কোত্থেকে ? জিরাফের তো লিটারেল কোন সেন্স হয় না …।
– সেন্স তো মনে করেন কিছুরই হয় না … সেন্স হওয়ানো লাগে ।
তারপর আমরা চুপ করে বসে থাকলাম । গুরু খুশি খুশি মুখে চারদিক দেখতে লাগলেন । ঝিঝি পোকারা আরও জোরে জোরে ডাকতে লাগল । আমার মনে হল ঝিঁঝিঁ পোকারা আসলে জগতের সব রহস্যগুলো পুথিপাঠের মত করে বলে যাচ্ছে । আমাদের মস্তিষ্কের কোন একটা অংশ সেই কথাগুলো বুঝতে পারছে । সংরক্ষিত মাঠগুলোতে হালকা হালকা কুয়াশাগুলো বেগুনী বর্ণ হতে লাগল । রাস্তাঘাট থেকে একটা গভীর হাহাকার এসে আমাদের বুকে ধাক্কা দেয় । সেই হাহাকরে শহরের লোকেরা অস্থির হয়ে যায় । তারা তড়িঘড়ি করে রিক্সা নিয়ে বাসায় যেতে চায় । একসময় গুরু বলল
– ছোটমামা এখনে আর কতক্ষণ বসে থাকবেন ? চলেন সামনে হাটাহাটি করি ।
– চলেন …
আমরা সামনে হাটাহাটি করতে করতেই গল্পের আরেকজন ক্যারেক্টরের দেখা পেলাম । কাল শার্ট পরা এক অতি সুদর্শন যুবক এসে পিঠে থাবা মেরে বলল
– দোস্ত খবর কি ?
– কে ?
– চিনতে পারস নাই ? আমি মাসুদ …
– আরে দোস্ত । তুই এখানে ? অ্যাট দিস আওয়ার ? করস কি ?
– ঘুরতে বাইরাইসি দোস্ত …তুই কি করস ?
– আমি গাঁজা টানতেসি …
মাসুদ বিরক্ত চোখে তাকাল । তার সুক্ষ রুচিবোধ খুব সম্ভবতঃ আহত হল । সে আমার ঘাড়ের উপর দিয়ে তাকাল । নীচু গলায় বলল
– দোস্ত ঐ পোলাডা কে ?
– কোন পোলাডা ?
– ঐ যে…
আমি দেখলাম মাসুদ দয়াল গুরুর দিকে দেখাইতেসে । উনাকে “পোলাডা” বলে সম্বোধন করার কোন কারণ নেই । তবে গুরুর চেহারা একেকজনের কাছে একেকরকম । মাসুদের কাছে যদি “পোলাডা” মনে হয় তাহলে আমার তো কিছুই করার নাই । মাসুদ সিগারেট ধরাল । আমি বললাম
– তুই এখানে কেন ? তোর পড়াশোনা নাই ?
– আছেই তো ..কিন্তু ভাল্লাগতেসে না
মাসুদ প্রাইভেট মেডিকেলে পড়ে । সরকারীতে চান্স পাইসিল । কিন্তু ঢাকার বাইরে যেতে হবে বলে মাসুদের বাপে ওরে এখানে বাংলাদেশ মেডিকেলে ভর্তি করায়ে দিল । মাসুদ সারদিন পড়াশোনা করে । আজকে আনেকদিন পর তাকে সাদা এপ্রন ছাড়া অবস্থায় দেখলাম । আমি গুরুকে বললাম
– গুরু , এ মাসুদ । আমার ফ্রেন্ড ।
মাসুদ এগিয়ে এসে বলল
– হ্যালো ব্রাদার …। কেমন আছেন । অঘ্রাণ মাসের শুভেচ্ছা আপনাকে ।
গুরু হাসলেন । হ্যান্ডশেকের জন্যে বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরে বললেন
– আপনি মাসুদ ?
– জ্বি ?
– আপনে কি ভাল লোক ? সুক্ষরুচিবোধ সম্পন্ন লোক ?
– অবশ্যই । দেখে বুঝেন না ?
– কথাটা তো ঠিক বললেন না রে ভাই । আপনাদের বাসার ঐ যে কাজের মেয়েটা কি জানি নাম জুলেখা না কি জানি …ঐ মেয়েটারে তো আপনে প্রেগনেন্ট করে ফেলেছিলেন ….করেন নাই ?
মাসুদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল । দয়াল গুরু হতাশ গলায় বললেন
– প্রেগনেন্ট করলেন তো ঠিকা আছে , তারুপ্রে আপনার মাস্তান বন্ধু বান্ধব দিয়ে মেয়েটাকে থ্রেট দিলেন এটা কি ঠিক হল …
মাসুদ করুণ গলায় বলল
– ভাই প্লিজ আর কইয়েন না
– আইচ্ছা যান কমু না ….
আমার হঠাৎ করেই মনে হল ,মাসুদকে তো খুন করা যাইতে পারে । সে আমার অতি প্রিয়জন । সুতরাং তারে খুন করাটা ইন্টারেস্টিং হবে ..। আমি পকেটে হাত ঢুকালাম । তারপরই মনে হল , নাহ আরেকটু দেখি । আমরা তিনজন হাটতে লাগলাম । আমি আরেকটা স্টিক ফাটালাম । আমার চোখ এত লাল হল যে রাস্তার হইলদা হইলদা বাতিগুলোকে মনে হল লাল রঙের । লাল হল পাপের রঙ । মুখরোচক পাপগুলির রঙ সবসময়ই লাল হয় । মাসুদের বাসার কাজের মেয়েটার শাড়ির রং কি লাল ছিল । আমি জিজ্ঞেস করলাম
– মাসুদ , তোদের কাজের মেয়েটার শাড়ির রঙ কি লাল ছিল ?
– হুম , টকটকা লাল । শাড়িটা আমিই কিনে দিয়েছিলাম ।
লাল রং আর ঝিঝি পোকাদের কোরাস । আহ অঘ্রাণ রাত্রি । আমি উদাস গলায় বললাম
“ মিঠা বাতাস ভরা অঘ্রাণ রাত্রি ,
বেগুনী কুয়াশাভরা সংরক্ষিত মাঠগুলা
ঝিঁঝিঁ পোকাদের ডাকে পৃথিবীর সব গভীর হাহাকার…..”
গুরু আগ্রহী গলায় বললেন
– এটা কি ?
– কবিতা …. গাঁজা টানলে আমার কবিতা লেখতে মন চায়
– ও ….তাই ..
মাসুদ নীচু গলায় বলল
– কোন বালের কবি আমার …শালা গানজুট্টি…
– কি কইলি দোস্ত ..
– কিছু না , সব কথা শুনতে নাই …
গুরু লজ্জা লজ্জা গলায় বললেন
– ছোটমামা , আমরে একটু দেনতো ..। আমিও একটা টান মেরে দেখি ।
গুরু পুরিয়ায় টান দিলেন । মাসুদও উদাস মুখে একটা টান দিল । ঝিঁঝিঁ পুকাদের সাথে সুর মিলিয়ে আমরা হো হো করে শব্দ করতে লাগলাম ।
গুরু বললেন
– ছোটমামা ,ঐ দেখেন আপনারে ডাকে …
– কে ডাকে ?
– ঐ যে …
আমি দুরে তাকালাম । চশমা ঠিক করে দেখলাম একজন তরুণী আমাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে । মাসুদ ভুরু কুঁচকে বলল
– ওয়েইট ওয়েইট , এখানে তো তরুনী আসার কোন কারণ নাই ।
– কারণ নাই মানে ?
– এই গল্পে তো সেক্সুয়াল কন্টেন্ট থাকার কথা না ।
– কেন সেক্সুয়াল কন্টেন্ট ছাড়া কি তরুনীদের আর কোন কাজ নাই ??
এই জাতীয় একটা নারীবাদী কমেন্ট করার পর মাসুদের চুপ না করে উপায় থাকল না । তাই আমরা তরুনীপানে এগিয়ে চললাম । আমি অবশ্য ঠিক মত তাকাতে পারছিলাম না । কারণ দুর থেকে মনে হচ্ছিল তরুনী সম্পুর্ণ নগ্ন অবস্থায় বসে আছে । অবশ্য এটা আমার অবদমিত যৌন বাসনার একটা বহিঃপ্রকাশও হতে পারে । কাছাকাছি এসে দেখি অতি রূপবতী এক তরুনী শাড়ি পরে বসে আছে । লাল শাড়ি । পাপের রঙ ।
আমি বললাম
– ম্যাডাম ডেকেছেন ?
– হুঁ , নাহিদ ভাই আমাকে চিনেন নাই ?
– না তো ? আচ্ছা ম্যাডাম দুর থেকে মনে হল আপনি নগ্ন হয়ে বসে ছিলেন । কেন মনে হল বলেন তো ?
সে বিরক্ত হল । দয়াল গুরু আমার মাথায় একটা থাপ্পড় দিয়ে চাপা গলায় বলল
– ছোটমামা কি কন এগুলা ?
তরুনী বলল
– বলবেই তো , পার্ভাট হারামজাদা একটা …
আমি বললাম
– আপনার কথা বলার ভংগিটা পরিচিত । আপনার পরিচয় ব্যাক্ত করেন ।
– আমি যুথী । মহাখালিতে আপনাদের পাশের বাসায় থাকতাম । মনে পড়ে ? নাকী নেশা করতে করতে মাথার সব ব্রেইন সেলগুলা হারাইসেন ?
আমি চমকে উঠে বললাম
– তুমি যুথী ? বল কি ? শুঁয়োপাকা থেকে প্রজাপতি হলে কবে ?
– হয়েছি এই কদিন হল । শুঁয়োপোকা ছিলাম যখন , তখন পাত্তা দেননি , এখন প্রজাপতির পিছে ছুটে কোন লাভ নাই … মরেন গিয়া আপনি ।
মাসুদ বলল
– যুথী আপনে ভাল ?
– জ্বি আপনি ভাল …
– হুঁ
মহাখালির বাসায় থাকার সময় যুথী মেয়েটা কিশোরী ছিল । রোগা হ্যাংলা একটা মেয়ে । আমার সাথে অনেক লজ্জা লজ্জা করে কথা বলত । আমি অনেক কিছুই বুঝতাম । তবে এড়িয়ে যেতাম । সেই শুয়োপোকা আজকে রঙিন প্রজাপতি হয়ে বিরাট ডানা মেলে বসে আছে । চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছে । ঝিঁঝিঁ পুখাদের ডাকের মতই পৃথিবীও রহস্যময় ।
গুরু বললেন
– ছোটমামী চলেন . হাটাহাটি করি ।
যুথী বলল
– আপনি আমাকে ছোটমামী বলছেন কেন ?
– আছে আরকী …বলার কারণ আছে ..
যুথী আর আমি সমানে সামনে হাটছি । গুরু মাসুদের সাথে সাথে পিছনে হাটছে । গুরু আগ্রহী গলায় মাসুদকে বলল , “ আপনি কি কোন এককালে জিরাফ পুষতেন ?”….
যুথী বলল
– আপনি মহাখালি ছেড়ে যাবার পর অনেক কিছু পাল্টে গেছে । আব্বু আরও বড়লোক হয়েছে । আপনি জানেন আমি এখন শিশা খাই ।
আমার হাসি পেল । তারপরেও হাসি চেপে রেখে বললাম
– তাই নাকী ? শিশা খাও ?
– হুঁ , আর আমার বয়ফ্রেন্ড আছে চারজন । তারা আবার আমার ব্যাপারে মারপিট করে পুলিশে ধরাও খায় ।
– ভালই তো , পাচজন থাকলে ভাল হত । তুমি দ্রৌপদী হয়ে যেতে । এরপর আমি কোন একদিন এসে তোমার বস্ত্র হরণ করতাম ।
– ছিঃ নাহিদ ভাই । আপনি এখনও মেয়েদের সাথে কথা বলতে শিখলেন না ….আপনার চোখ এত লাল কেন ? গাঁজা খেয়েছেন ?
আমি হাসলাম । আমার পকেটের ছুড়িটা কেঁপে উঠল । বুঝলাম এই তরুনীকে খুন করতে হবে । আমি চকচকে চোখে তাকালাম ।
– হল্ট , কেডা যায় ? খাড়া তোরা…….
আমার চিন্তার সুতা কেটে গেল । মধ্যবয়স্ক এক পুলিশ দাড়িয়ে আছে । আমি বললাম
– কি হইসে ভাই ?
– চেকিং হবে ….আপনারা পাচজন লাইনে খাড়ান । আমি মোহাম্মাদপুর থানার ওসি খাইরুল কবির ।
– ওসি সাহেব কেন রাস্তায় ডিউটি দিচ্ছেন বুঝলাম না । আপনার ডিউটি তো থানায় ।
– আর কইয়েন না , সব পুলিশ অঘ্রাণের বাতাসে পাগল হয়ে বনে চলে গেছে । আমার থানা পুরা ফাকা ।… আপনি কি এই দলের লিডার ?
– হুঁ… কওয়া যায় ।
যুথী বলল
– এক্সকিউজ মি , নাহিদ ভাই আপনাকে লিডার বানানো হল কখন ?
– চুপ থাক , আমিই লিডার ।
ওসি সাহেব বললেন
– এই মেয়ে কে ? ভাড়া করসেন নাকী ? নাকী আপনেই দালাল …..
যুথী কড়া গলায় বলল
– এটা কি ধরণের কথা ? আপনি জানেন আমি কার মেয়ে ?
– নাগো মা জানি না । তুমি যেই রাজকন্যাই হও রাত বিরাতে রাস্তায় ধরলে আমার মত ছোটলোক পুলিশ এই কথাই বলবে ।
গুরু আর মাসুদ এগিয়ে আসল । মাসুদ বলল
– এনি প্রবলেম ?
– নো প্রবলেম । আপনাদের চেকিং হবে ।
তারপর গলা নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
– ঐ লম্বা মত লোকটা কে ? ঐ যে দাড়ি ওয়ালা ….
দয়ালগুরু এগিয়ে আসলেন । হাসিমুখে বললেন
– আমি ইয়ে । আমি জিরাফের ব্যবসা করি ….।
ওসি সাহেব অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন । চেকিং করে আমার পকেটে চাকু আর গাঁজা পাওয়া গেল । ওসি সাহেব আমাদের এরেস্ট করে থানার পথে নিয়ে চললেন । মাসুদ বিরক্ত গলায় বলল
– এই খানকির পোলা নাহিদের সাথে আমি যদি আর জীবনেও দেখা করসি …. শালা তোর জন্যে সবাই ধরা খাইল । একটা সরি তো বলা উচিৎ ।
আমি কিছুই বললাম না । যুথী বলল
– হ্যা , নাহিদ ভাই .. আপনার তো একটা সরি বলা উচিৎ…
আমরা থানায় যাচ্ছি হেটে হেটে । আমাদের কারও হাতেই হাতকড়া নাই । পুলিশ ভ্যানও নাই । এরকম অব্যবস্থাপনায় এরেস্ট হওয়াটাও একটা বেইজ্জতির ব্যাপার । দলের অগ্রভাগের ওসি সাহেব বললেন
– প্রবলেম হয়ে গেল তো …. রাস্তা তো মনে হয় ভুল করসি ……
– ভুল করারই কথা … যেভাবে ঝিঁঝিঁ পুখারা চিৎকার করছে আর বেগুনী ধুয়া উড়ছে তাতে যে কারোরই বিভ্রম হবে ।
– ভ্যাজভ্যাজ করবেন না তো ..চিন্তা করতে দেন …
আরও অনেকক্ষণ হাটার পর আমার পা ব্যাথা করতে লাগল । ওসি সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন
– ভাই সরি , আপনাদেরকে মনে হয় থানায় নিয়ে যেতে পারব না । আমি রাস্তা চিনতেসি না । বিশ্বাস করেন , আমার এরকম হয় না । এই রাস্তায় আমার গত বিশ বছর ধরে যাতায়াত আছে ।
আমি বললাম
– মন খারাপ করবেন না । এরকম হতেই পারে । আমরা তাহলে যাই ।
– আমিও আসি আপনাদের সাথে ?
গুরু বললেন
– কেন আসতে চান আমাদের সাথে ?
ওসি সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস গলায় বললেন
– এককালে আমিও জিরাফের দেখাশোনা করতাম ।
আমরা রাস্তায় হাটা ধরলাম ।

রাস্তায় আমারা পাচজন । তারা চারজন অনেক কথা বলছে । আমি একটু দূরে দূরে হাটছি । চারজনের দলে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে যূথীর আর ওসি সাহেবের গলা । যুথী শেয়ার বাজার ব্যবসা নিয়ে একটা বিশ্লেষণ দিল । ওসি সাহেব মুগ্ধ গলায় বললেন
– আমার বয়স আর বিশ বছর কম হলে আমি আপনাকে প্রেমের প্রস্তাব দিতাম ।
দলের সবাই হো হো করে হাসতে লাগল । তারপর আবার নীরবতা নেমে আসল । আমার কাছে রাস্তাঘাটের সিমেন্টকে কাদার মত নরম মনে হল । সেই কর্দমাক্ত রাস্তার হাহাকারে আমার চোখে জল আসে । যুথী চাপা গলায় বলল
– কাঁদছেন নাকী নাহিদ ভাই ?
– কই নাতো …
– আপনি কি জানেন ,যে আপনি সারাজীবনই কাঁদবেন ? ক্ষ্যাপার মত ছুটে বেড়াবেন আর পাপ করবেন এমন একটা কিছুর জন্যে যেটা ছোঁয়ার সাধ্য নাই আপনার কোন কালেই ।
আমি কিছু বললাম না । আরেকটা স্টিক ধরালাম । যুথীর কথাটা ঠিক । আজকে রাতে যে আমি যূথীকে খুন করব এটা কেন ? ঐ যে ঐ জিনিসটা ওটাকে ধরার জন্যে । জানি আমি ধরতে পারব না । তারপরও চেষ্টা করব । এই জীবন পার হয়ে যাবে চেষ্টায় , চেষ্টায় ।
মাসুদ বলল
– আজকাল আর আমার বেঁচে থাকতে ভাল লাগেনা ।
আমি বললাম
– কেন ?
– বেচে থাকার আর কোন মিনিং নাই । আমার অনেক ব্যাপার আছে । কাউকে বলা যাবে না । কাউকে বললে সেই ব্যাপারগুলার সৌন্দর্য নষ্ট হবে ….
– থাকে থাকে সবারই থাকে …তারপরেও বেঁচে থাকতে হয় ।
– কেন বেঁচে থাকলে কি হয় ?
ওসি সাহেব চিন্তিত গলায় বললেন , “ বেঁচে থাকলে সেক্স করা যায় ..”
আমি বললাম , “ বেঁচে থাকলে গাঁজা খাওয়া যায় …”
গুরু উৎফুল্ল গলায় বল্লেন , “ বেঁচে থাকলে জিরাফের দেখাশোনা করা যায় … ঝিঁঝিঁ পোকাদের ডাক শোনা যায় …”
যুথী কিছু বলল না । সেও হয়ত বেঁচে থাকার বিশেষ কোন অর্থ পাচ্ছে না ।
মাসুদ বলল
– নাহিদ , মারা গেলে কেমন হয় ? খুব স্বাভাবিক ভাবে আত্নহত্যা করি । উঁচা একটা বিল্ডিঙে উঠে লাফ দিলাম , মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবার একটা ড্রামাটিক ব্যাপার আছে ।
– কর , ইচ্ছা । করে ভাল লাগলে আমারে কইস । আমিও করে দেখব ।
মাসুদের চোখ চকচক করে উঠল । গুরু চিন্তিত গলায় বললেন
– তাহলে চলেন ছোটমামা আমরা একটা বিল্ডিং খুজে বাইর করি । মাসুদ ভাই সুসাইড করুক আর আমরা ছাদে হাওয়ায় বসে গান বাজনা করি ..গাঁজা খাই …
প্রস্তাবটা সবারই পছন্দ হল । সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হল ।

শেষ অংশ :

আমরা সবাই ছাদে । অমাবস্যার রাত । তাই আকাশে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র বিস্মিত হয়ে জ্বলজ্বল করছে । মাসুদ ছাদের কার্নিশে দাড়িয়ে আছে । আনন্দে তার চকচক করছে । সে বলল
– দোস্ত দেখ দেখ , রাস্তাটা হাত বাড়ায়ে আমারে নীচ থেকে ডাকতেসে …
– মাসুদ ভ্যাক ভ্যাক করিস নাতো ….লাফ দিলে লাফ দে ….
গুরু আর ওসি সাহেব গাঁজা টানছেন আর গান গাচ্ছেন । গুরুর গলা বেশ ভাল । তিনি লালনের গান ধরলেন
“ বাড়ির পাশে আড়শি নগর …তাহার পাশে গভীর জংগল ….সেথায় এক পড়শি বসত করে…..আমি একদিনও না দেখিলাম তারে …”
ওসি সাহেব তাল দেবার সময় মুখ দিয়ে “হুইইইই” করে শব্দ করেন । যেই শব্দ শুনে যূথী চমকে উঠে । আমি বলি
– যূথী আমি ঠিক করেছি একটা খুন করব …
যুথী ক্লান্ত গলায় বলল
– আমি জানতাম ….আপনাকে প্রথমদিন দেখেই বুঝেছিলাম আপনিই আমাকে খুন করবেন ….
– কেমনে বুঝছিলা ?
– মেয়েরা অনেক কিছু বুঝে নাহিদ ভাই । মেয়েদের অনেক ক্ষমতা দিয়ে পাঠানো হয় ….
ছাদের কার্নিশে মাসুদকে আর দেখা যাচ্ছে না । সে কি লাফিয়ে নীচে পড়ে গেছে ? কে জানে হয়ত গেছে । গুরু গানে টান দিচ্ছেন , আমি দেখলাম চারপাশের সবকিছুতে লাল রং দেখা যাচ্ছে । গভীর পাপের এক লাল রঙ । আমি হতাশ গলায় বললাম
– পৃথিবী অদ্ভুত মধুময় এক জায়গা …..
তারপর চাকু নিয়ে আমার পাশে থাকা তরুনীর উপ্রে ঝাপিয়ে পড়লাম । ঝিঁঝিঁ পোকাদের শব্দে পৃথিবীর সব শব্দ চাপা পড়ে গেল ।
ঝিঁঝিঁদের গানে পৃথিবীর সেই জটিল হাহাকার।

night

যেখান থেকে কপি করা: http://choturmatrik.com/blogs/%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%98%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE/%E0%A6%9D%E0%A6%BF%E0%A6%81%E0%A6%9D%E0%A6%BF%E0%A6%81-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%96%E0%A6%BE-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%89%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%81%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B8

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s