সুপ্রিয়াকে তাই আমি ঘৃণা করি

Sad-Girl-Portrait

মেয়েটা আমার সামনেই মারা গেল। ২৩/২৪ বছরের একটা ছোট শরীর, ফর্সা শরীর। দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া নরম একটা শরীর।
মেয়েটার চেহারা বোঝা যাচ্ছিল না। মাথার একপাশ থেঁতলে গেছে। গোলাপি জামাটার হাতা ছিঁড়ে গেছে। রক্তগুলো শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। কপালে কাল টিপখানা ছিল তখনও । একদম ঠিকঠাক। এতো বীভৎসতার মাঝে ছোট্ট একটা টিপ।

মেয়েটা কিন্তু বেঁচে ছিল। আমি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম মেয়েটা বেঁচে আছে। কিছু একটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছিল। জোর ছিল না। গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না। আধবোজা চোখ নিয়ে দুই একবার তাকাল মনে হয়। মাথাটা থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছেই। আমি আমার জীবনে এত রক্ত দেখিনি। রক্ত এত্ত বিচ্ছিরি? এত ভয়ংকর?

হাজার হাজার বাঙ্গালী রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রক্তমাখা শরীর দেখবে, কিন্তু এগিয়ে আসবে দুই একজন। তবুও তিনজনকে পেলাম। পাশেই হাসপাতাল ছিল। মেয়েটার দিকে তাকানোর সুযোগ ছিল না। বাঁচাতে হবে । যে করেই হোক বাঁচাতে হবে।

মেয়েটাকে আমরা বাঁচাতে পারি নি। ঠিক কি কারনে জানি না খারাপ লাগলো খুব। ইচ্ছে করলো মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেই। কানে কানে কিছু একটা বলে সান্তনা দেই। ইচ্ছে করলো মেয়েটার এলোমেলো চুল ঠিকঠাক করে দেই। সকাল সকাল চিরুনি মাথায় বুলিয়েই তো বের হয়েছিল। সামান্য ধাক্কায় সুন্দর চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাবে এটা কেমন কথা?

ব্যাগে ওরা কিছুই পেল না তেমন। কয়েকটা বই খাতা, একটা ছাতা, আরেকটা ছোট ব্যাগ যেটাতে সব মিলিয়ে ৪৬৩ টাকা। কোন ফোন পেল না। কথাও ছিটকে পড়েছে হয়তো। বইয়ের উপর নাম লেখা কাকলী বিশ্বাস (সুপ্রিয়া)। আর কিচ্ছু না।

সুপ্রিয়া নামের মেয়েটাকে আমি আর দেখতে পেলাম না। রক্তেভেজা শার্ট গায়ে চাপিয়ে থাকতে পারছিলাম না আর।একটু পর পর কেন যেন গা গুলিয়ে আসছিল। বাসায় চলে এলাম।একজন নার্সের নাম্বার নিয়ে আসলাম । চাচ্ছিলাম মেয়েটা বাসায় ফিরে যাক। থেঁতলে যাওয়া মাথাটা নিয়েই বাসায় ফিরে যাক। মা-বাবা চিৎকার করে কাঁদুক। ভাইবোনরা হাত ধরে বসে থাকুক। আদর করে গায়ে মাখা রক্তগুলো কেউ ধুয়ে দিক, কলাপে কেউ চুমু খাক।

ফোন করে করে আমি আমার মেজাজ খারাপ করেছি অনেকবার। কাওকে পাওয়া যায় নি। মেয়েটা তিন দিন ধরে হাসপাতালের মর্গে পরে ছিল। তিনটা দিন, তিনটা রাত। আশ্চর্য! মেয়েটার কেউ খোঁজ করেনি নাকি? একটা মেয়ে বাসায় ফেরেনি। সুপ্রিয়া বাসায় ফেরেনি। পরিবারের একটা মানুষ তিনদিন ধরে নেই। হয়তো পরিবারের গুরুগম্ভীর বড় মেয়ে কিংবা আদরের ছোট মেয়ে। হয়তো বাবা-মার একমাত্র মেয়ে। মেয়েটা হারিয়ে যায়নি। একটা বেসরকারি হাসপাতালে তিন ধরে পরে আছে।
তিনদিনে কি মানুষ পচে যায়, গন্ধ ছড়ায়? ভারী পচা গন্ধ ছড়ানো সুপ্রিয়া হারিয়ে গেল। আমি আর খুঁজে পেলাম না। খুঁজতে চাই নি, জানতেও চাই নি। ফোন করে মেজাজ খারাপ করতে চাই নি আর। আমি ধরে নিয়েছি মেয়েটা বাসায় ফিরেছে। আমি ধরে নিয়েছি মেয়েটার শরীরটা ধুয়ে কালচে বিচ্ছিরি রক্ত পরিষ্কার করা হয়েছে। গন্ধ ছড়ানো সুপ্রিয়াকে দেখে বাবা-মা নাকে হাত দেন নি। আমি ধরে নিয়েছি আদরের ছোট বোনটা কিংবা ভাইটা সুপ্রিয়ার থেঁতলে যাওয়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে।

আমার সাদা শার্টএ সুপ্রিয়ার রক্তের দাগ আছে এখনও। দাগগুলো পুরোপুরি উঠেনি। একটা যায়গায় হালকা লাল ছোপ ছোপ দাগ। অনেকবার ধুয়েছি, সারারাত ওয়াশিং পাউডার পানিতে গুলে ভিজিয়ে রেখেছি। দাগ যায়নি।
সুপ্রিয়াকে আমার আঁকরে ধরাটা ঠিক হয়নি। আমার দামি সাদা শার্ট একটাই। এই শার্টটা পরেই ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে ইন্টারভিউ দিতে হয় আমার। একটা সামান্য চাকরীর জন্য ৪৭০ টাকায় কেনা জুতাটার সোল ক্ষয় করতে হয়। দামি সাদা শার্ট গায়ে দিয়ে সুপ্রিয়াকে বুকে টেনে আমি ভুল করেছি। অনেক মানুষই তো সেদিন রাস্তায় ছিল। আমি এগিয়ে না এলে কেউ না কেউ তো এগিয়ে আসতোই।

সেদিন ইন্টারভিউ দেয়া হয়নি। দুপুরে খাওয়া হয় নি। বিকেলে বড় মাঠটায় বসে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়া হয়নি, রাতে ভালো ঘুম হয়নি। পরদিন ঘুম থেকে উঠে রুনুকে ফোন দেয়া হয় নি।

সুপ্রিয়া আমার অনেকটা দিন গিলে গিলে খেয়েছে। কাকলী বিশ্বাস সুপ্রিয়াকে তাই আমি ঘৃণা করি।

লিখেছেনঃ সূর্যস্নাত রজনী

বই লাভার্স পোলাপান গ্রুপে প্রকাশিত

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s