হাঁসফাঁস

stuning-brisbane-by-night‘২০০ বছর ইংরেজরা বাংলাদেশে থাকল, কেউ কি কোনো গামছা পরা ইংরেজ দেখছেন। দেখেন নাই। রোমান শুধু আমাদেরই হতে হয়। শোনেন ভাই, আপনার হেডম (সাহস) নাই, তাই আপনি রোমে যাইয়া রোমান হবেন, আমেরিকা যাইয়া আমেরিকান হবেন, এমনকি আফগানিস্তান যাইয়া তালেবান হবেন। আমার হেডম আছে, আমি চাঁদে যাইয়াও বাঙালি থাকমু।’

কিছুদিন আগের কথা৷ গিয়েছিলাম এক জন্মদিন অনুষ্ঠানে৷ সবুজ ভাইয়ের মেয়ের জন্মদিন। সাংসারিক নানা ঝামেলায় যেতে একটু দেরি হয়ে গেল। গিয়ে দেখি বেশ ভালো লোক সমাগম। সবাইকেই চিনি। অচেনার মাঝে দেখলাম লুঙ্গি–পাঞ্জাবী পরিহিত এক ভদ্রলোক। আমার নাতিদীর্ঘ প্রবাসজীবনে কোনো সামজিক অনুষ্ঠানে লুঙ্গি পরা কাউকে দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না। কৌতূহলী হলাম একটু। সবুজ ভাইকে আড়ালে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই উনি কে?’

‘বউয়ের দিকের আত্মীয়। আমেরিকার এক ইউনিভার্সিটিতে আছেন গত ১৫ বছর। এখানে এসেছেন এক কনফারেন্সে। বিরাট চিজ।’
—‘চীজ কেন, কাহিনি কী?’
মেহমানের তদারকিতে ব্যস্ত হয়ে যান সবুজ ভাই। কাহিনি আর বলতে পারেন না।
টিভিতে তখন অস্ট্রেলিয়া–ভারতের খেলা দেখাচ্ছে। সবাই তা–ই দেখছে। আমিও শামিল হলাম। এ রকম জমায়েতে যা হয়, এক ভাই রানিং কমেন্ট্রির মতো বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলে যাচ্ছেন। এর মাঝেই টেন্ডুলকার আউট হলো। সেই ভাই বললেন, ‘দেখছেন মিড উইকেটে ফিল্ডার দেখেও কেউ এইভাবে পুল শট খেলে।’

—‘ভাই আপনিতো স্কয়ার লেগ, মিড উইকেট, হুক-পুল এর পার্থক্য বোঝেন না। আবার শচীন কয়টা আন্ডা মারছে সেটা মুখস্থ করে বসে আছেন।’ সবুজ ভাইয়ের আত্মীয় নির্বিকারভাবে বলেন। সবাই চমকে ওঠেন। তাঁর কোনো ভাবান্তর নাই। পান চিবোতে চিবোতে দিব্যি খেলা দেখতে থাকেন। আমি সুযোগ খুঁজতে থাকি কীভাবে এই ‘চিজ’–এর সঙ্গে কথা বলা যায়। সুযোগ আসে৷
—‘কেমন লাগছে অস্ট্রেলিয়া ভাই?’ আমি আলাপ শুরু করি।
‘আলাদা কিছু লাগছে না। তোমার দেশের বাড়ি কোথায়?’
—‘পিরোজপুর’। উত্তর দিই।
‘কও কি ভাইডি। তুমি তো আমার দেশি ভাই।’
কথায় কথায় জানলাম ভাইয়ের নাম বরকত। ২৪ বছরের প্রবাসজীবন। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত।
—‘ভাই এই যে আপনি এভাবে থাকেন, কথা বলেন, অসুবিধা হয় না?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
‘কিসের কথা কও ভাইডি?’
—‘না মানে ইয়ে…৷’
‘ও বুজছি। ভাইডি শোনো। সকালে গরু স্কুলের মাঠে ছাইড়া দিয়া ক্লাস করছি। বিকালে গরু নিয়া বাসায় ফিরছি। মেধা আর চেষ্টায় যখন একটা পর্যায়ে আইলাম, তখন আমিও চেষ্টা করছিরে ভাইডি বদলাইতে।’
—‘তাহলে?’ আমি আবার জিজ্ঞেস করি।
‘হাঁসফাঁস লাগেরে ভাইডি। এই যে তুমি যে জিনস পইরা আছো, ৩০ বছর আগে আমিও পরতে চেষ্টা করছি। ছালা ছালা লাগে, শরীর কুটকুট করে। পারি নাই সহ্য করতে। কাপড়ের প্যান্টেই ফিরা গেছি।’
—‘সমস্যা হয় না?’
‘প্রথম প্রথম খুব অসুবিধা হইতো। এখন সবাই মাইনা নিছে। ইউনিভার্সিটিতে আড়ালে ছাত্ররা আমারে ডাকে কি জানো—OHS’
—মানে কী?
‘Original Homo Sapiens-আদি মানব। তবে একটাই জীবন, হাঁসফাঁস কইরা কাটাবার কোনো মানে নাইরে ভাইডি।’

এর মাঝেই খাবারের ডাক আসে। খেতে খেতে আমাদের প্রিয় বিষয় দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে কথা শুরু হয়। কথায় কথায় এক ভদ্রলোক বলে ফেলেন, ‘এই তো দেশ থেকে আসলাম। দেশের যা অবস্থা, ভদ্রলোকের বাসের অযোগ্য।’
‘আপনার মা–বাবা ভাইবোনরাও কিন্তু তাহলে অভদ্র হয়ে যায়। দেশের সমালোচনা দেশে বসে করাই ভালো। আর আপনি যে ডিগ্রির জোরে এই দেশে এসেছেন, সেটাতেও কিন্তু ওই অভাগা দেশটার অবদান আছে ভাই।’ বরকত ভাই নির্লিপ্ত স্বরে বলেন।
ভদ্রলোকের মুখ কালো হয়ে যায়। সবুজ ভাই খুবই বিব্রত বোধ করেন। বাচ্চারা কেক কাটা শুরু করাতে পরিবেশটা একটু হালকা হয়। কেক খাবার পরে সবাই চা–কফি নেয়। বরকত ভাই দেখি পিরিচে ঢেলে চা খাচ্ছেন।
‘সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও কেউ কেউ সাধারণ এটিকেট শিখতে পারেন না।’ এক সংক্ষুব্ধ ভাই ভাববাচ্যে খোঁচা দেন। বরকত ভাই নীরবে হজম করেন। ‘রোমে গিয়ে রোমান হওয়াটাইতো ভালো।’ আর এক ভাই ফোঁড়ন কাটেন।

‘২০০ বছর ইংরেজরা বাংলাদেশে থাকল, কেউ কি কোনো গামছা পরা ইংরেজ দেখছেন। দেখেন নাই। রোমান শুধু আমাদেরই হতে হয়। শোনেন ভাই, আপনার হেডম (সাহস) নাই, তাই আপনি রোমে যাইয়া রোমান হবেন, আমেরিকা যাইয়া আমেরিকান হবেন, এমনকি আফগানিস্তান যাইয়া তালেবান হবেন। আমার হেডম আছে, আমি চাঁদে যাইয়াও বাঙালি থাকমু।’ বলেই বরকত ভাই পিরিচের চায়ে সুরুত করে টান দেন।
বরকত ভাইয়ের কথা শুনে আমাদের হাঁসফাঁস লাগে। হেডমের অভাবেই কি না, সেটা ঠিক বোঝা যায় না।

মোস্তাফিজুর রহমান, ব্রিসবেন (অস্ট্রেলিয়া) থেকে | ১৩ জানুয়ারি, ২০১৫

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s