প্রফেসর মরিয়ার্টি

১.
প্রফেসর মারিয়ার্টি খুব দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছেন। এমন নয় যে তিনি ড্রাইভিংয়ে খুব পাকা, তারপরও চালাতে হচ্ছে কারণ তাকে শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছতে হবে দু’ঘন্টার মধ্যে। আজ যে বিষয়টার উপর লেকচার দিতে হবে, তা হলো তার নিজের আবিস্কার করা আলোর প্রতিসরণের সংক্ষিপ্ততম পথের সমীকরণ; গতবছর এই সমীকরণের করার জন্য তাকে গেটস-প্রাইজ দেয়া হয়। আজ হতে দু’শো বছর আগে বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তিত্ব বিল গেটস এই পুরস্কারের প্রচলন করেছিলেন! তার মৃত্যুর পর তার বিলিয়ন ডলারের সম্পত্তির ইন্টারেস্ট থেকে পুরস্কারটা দেওয়া হয়।
প্রফেসর তার সমীকরণে দেখিয়েছিলেন যে ফার্মাটের সূত্র-Light follows the path of least time অর্থাৎ আলো সেই পথেই চলে যে পথ সে ন্যূনতম সময়ে অতিক্রম করতে পারে, এই সূত্র পুরোপুরি সঠিক নয়। বিশেষ কিছু পদার্থ দ্বারা তৈরি ক্রিস্টাল মাধ্যমে আলো এই সূত্র মেনে চলে না। অবশ্য ফার্মাট সাহেবকে দোষ দেওয়া যায় না, তিনি যখন এই সূত্রটা আবিস্কার করেছেন তখন মানুষের জানা মতে মৌলিক পদার্থ ছিল মাত্র ৫০-৬০ টার মতো।
352956-college_professor1
গাড়ির সামনে একটা কুকুর পড়তেই চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে গেল প্রফেসরের।স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে প্রচন্ড জোরে গাড়ির ব্রেক কষলেন।ফলে যা হবার তাই হলো। গাড়িটা রাস্তার পাশের একটা ল্যামপোস্টে গিয়ে বারি খেল অসম্ভব জোরে। তার চোখের সামনে থেকে ফার্টের আলোর সূত্র গায়েব হয়ে অন্ধকার নেমে এলো। জ্ঞান হারালেন তিনি।

২.
“স্যার মারিয়ার্টি, আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? স্যার? শুনতে পাচ্ছেন?”

চোখ মেলে প্রথমেই যাকে দেখলেন তিনি, সে সাদা এপ্রন পরা অল্পবয়সী এক ডাক্তার। বুকের নেমপ্লেটে নামও লেখা আছে-ড্যানিয়েল সিম্পসন। প্রফেসর মারিয়ার্টিকে চোখ খুলতে দেখে সুন্দর করে হাসল সে।

“স্যার, আপনি কেমন বোধ করছেন?”

“ভালো। আমি কোথায়?”

“সেন্ট্রাল হসপিটাল অফ শিকাগোতে। আপনার গাড়ি ক্র্যাশ করেছিল স্যার, লোকাল পুলিস আপনাকে এখানে পৌঁছে দিয়েছে।”

“তুমি আমাকে কিভাবে চিনলে?”

“স্যার, পুলিস আপনাকে চিনেছে ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে। তবে আমি আপনাকে দেখেই ঠিকই চিনেছি স্যার। আপনিই সেই বিখ্যাত বিজ্ঞানী এমেট মারিয়ার্টি,দুবছর আগে ল অফ এন্টিপড গ্র্যাভিটি আবিস্কার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।”

প্রফেসর কিছু বললেন না। তার কিঞ্চিৎ মন খারাপ হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবে। তার একেকটা লেকচার শোনার জন্য ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া থেকে স্টুডেন্টরা ছুটে আসে। অথচ নিজের গাধামীর জন্য ছাত্রদের বঞ্চিত হতে হলো!
ডাক্তার বলল-

“দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই স্যার, আপনার তেমন কোন মেজর ইনজ্যুরি হয়নি। আপনি আজই বাড়ি যেতে পারবেন।”

“ধন্যবাদ।”

ছোকড়া ডাক্তার চলে যেতে গিয়েও যাচ্ছে না! হাত কচলাচ্ছে, যেন বলতে চাইছে একটা কিছু। সেটা বুঝতে পেরে মারিয়ার্টি বললেন-
“কিছু বলতে চাও?”

“স্যার, আপনি কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করি?”

“করো!”

“আপনার ট্রিটমেন্ট করার সময় একটা অদ্ভূত জিনিস আবিস্কার করলাম স্যার; আপনার ডানদিকের নিচের মাড়ির একটা দাঁত স্কেলিং করা। সম্ভবত কোন কারণে দাঁতটার কোন ক্ষতি হয়েছিল,পোকায় খেয়েছিল কিংবা ভেঙে গিয়েছিল।”

“তো?”

“তো স্যার, সমস্যা হলো আজকের যুগে কেউ আর দাঁত স্কেলিং করায় না। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর উন্নতির ফলে অনেক কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আবিস্কার হয়েছে, কারো দাঁত নষ্ট হলে তার ডিএনএ-র সাথে ম্যাচ করে নতুন আর্টিফিশিয়াল টিথ লাগিয়ে দেওয়া হয়। আর ছোটখাটো জীবানুজনিত সমস্যা হলে বিশেষ ধরনের ফ্লুরাইড গ্যাস দিয়ে পরিস্কার করা হয়। পৃথিবীতে সর্বশেষ যে স্কেলিংয়ের রেকর্ড আছে, সেটা ২০৫৯ সালে! আজ থেকে দেড়শো বছর আগের কথা।”

ডাক্তারের কথা শুনে প্রফেসরের মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। আসলেই তো। এই যুগে কারো দাঁত স্কেলিং করা হয় না।

৩.
প্রায় একসপ্তাহ হলো প্রফেসর এমেট মারিয়ার্টি নিজের ঘর থেকে বাইরে বেরোননি। পরিচিতরা ভাবছে, নিশ্চয়ই তিনি নতুন কোন তত্ত্ব নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত। আসলে তা নয়। সেই এক্সিডেন্টের পর মারিয়ার্টির মধ্যে অদ্ভূত পরিবর্তন এসেছে। গতরাতে তিনি আয়নার সামনে দাড়িয়ে দাডিয়ে নিজের দাঁত পরীক্ষা করছিলেন। আসলেই একটা দাঁত রুট ক্যানাল করে স্কেলিং করানো। অতি প্রাচীন পদ্ধতি। এ যুগের রোগীদের এসব ঝামেলার মধ্যে যেতে হয় না। ক্যালসিয়ামের সাথে ১৯২ আর ২০৩ নম্বর মৌল মিলিয়ে ক্যালসিয়াম হেক্সিডিডো বার্নিয়াম দ্বারা তৈরি দাঁত লাগিয়ে দেওয়া হয়।
প্রফেসর বেশ চিন্তিত এসব ভেবে। তার চিন্তার কারণ আরো বেড়ে গিয়েছে যখন তিনি আবিস্কার করলেন তার ড্রাইভিং লাইসেন্স মাত্র ৭ বছর পুরনো। ৭ বছর আগে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না। অথচ তিনি স্পষ্ট মনে করতে পারছেন যে তিনি বিশ বছর বয়সেই ড্রাইভিং শিখেছেন।

তবে শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্সই নয়, তার কোন ধরনের ডক্যুমেন্টের বয়সই সাত বছরের বেশি নয়। এমনকি তার ইমেইল আইডি এবং অন্যান্য সোশ্যাল সাইট আইডিও মাত্র সাত বছরের পুরনো। তার ঘরে যেসব বইপত্র আছে, তার কোনটাই সাত বছরের বেশি আগের এডিশন নয়। দেখে শুনে মনে হচ্ছে, প্রফেসরের বয়স যেন মাত্র সাত বছর।

৪.
বিজ্ঞান একাডেমির প্রেসিডেন্ট গভীর মনোযোগে ক্রে-১ সেভেনথ জেনারেশন কম্পিউটারের স্ক্রিনে আঁকাবাঁকা রেখা দেখছিলেন। মনোযোগ ভাঙাল তার সুন্দরী পিএস লরা এসে।
“স্যার, ইউনিভার্সটি অব শিকাগো থেকে প্রফেসর এমেট মারিয়ার্টি এসেছেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে।”

ধরমর করে উঠে দাড়ালেন প্রেসিডেন্ট।

“ওনার মতো বিজ্ঞানীকে বাইরে দাড় করিয়ে রেখেছ? জলদি ভিতরে নিয়ে এসো, যাও!!”

পিএস ছুটে গেল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মারিয়ার্টি ভিতরে প্রবেশ করলেন। তার উস্কোখুস্কো চুল আর লাল লাল চোখে রাত জাগার ছাপ স্পষ্ট!

“মি. মারিয়ার্টি যে,বসুন বসুন!”

মারিয়ার্টি বসলেন ঠিকই, তবে তার আগে কামড়ার ইলেক্ট্রিক লক অন করে দিলেন। প্রেসিডেন্ট অবাক হলেও কিছু বললেন না, তিনি জানেন বিজ্ঞানী মাত্রই কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের হয়।

মারিয়ার্টি খুব ঠান্ডা গলায় প্রেসিডেন্টের দিকে তাকিয়ে বললেন-“মি. প্রেসিডেন্ট, আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে আমি যখন যেটা করার প্রতিজ্ঞা করি, সেটা করে ছাড়ি?”

“জ্বী, অবশ্যই! আপনার অধ্যাবসায় নিয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ নেই। নতুন কোন থিওরি আবিস্কার করেছেন নাকি? শুনলাম দিন পনের ঘর থেকে বেরোননি?”

মারিয়ার্টি জবাব দিলেন না, একটা অটোমেটিক রিভলবার বের করলেন।
“একটা প্রশ্ন মাত্র একবারই করব মি. প্রেসিডেন্ট! উত্তর দিতে দেরি হলে কিংবা মাম্বলিং করলে সাথে সাথে আপনার ব্রেইন উড়িয়ে দেব। জানেন তো, ব্রেইন-ই একমাত্র বস্তু যেটার কৃত্রিম অঙ্গ এখনো আবিস্কার হয়নি! সুতরাং প্রশ্নের উত্তরগুলো দ্রুত চাই!”

প্রেসিডেন্টের চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

“এসব কি বলছেন আপনি প্রফেসর? কাজ করতে করতে কি আপনার মাথাটা গেছে?”

“আমার প্রথম প্রশ্ন, আমার বয়স তিনশো বছরেরও বেশি! কিন্তু কেন?”

“হোয়াট?”

“ভান করবেন না মি.প্রেসিডেন্ট, সেন্ট্রাল হসপিটালের এক ছোকড়া ডাক্তারকে দিয়ে আমার বয়স মিজিওর করিয়েছি গতকাল। হিসেব মতে, আমার জন্ম হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। আজ হতে প্রায় তিনশো বছর আগে! এতদিন ধরে আমি বেঁচে আছি, কিভাবে?”

প্রেসিডেন্ট চুপ করে রইলেন। এই দিন আসবে তিনি জানতেন, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবে তা জানতেন না!

“ঠিক আছে প্রফেসর, আপনি যখন সব জেনেই ফেলেছেন, তখন আর লুকিয়ে কি লাভ!”

“কি লুকিয়েছেন আপনি?”

“আপনি বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের নাম শুনেছেন?”

“ই ইজ ইক্যুয়েলটু এমসি স্কয়ার আবিস্কার করেছিলেন, তিনি?”

“হ্যা! আইনস্টাইন শেষ বয়সে কোথায় ছিলেন সেটা জানেন?”

“না, কোথায় ছিলেন?”

“বলছি।” লম্বা দম নিলেন প্রেসিডেন্ট।

“জার্মানিতে তখন হিটলার গণহারে ইহুদি নিধন করে চলেছেন। ফ্রয়েডের সকল রচনা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আইনস্টাইনকে হত্যা করার জন্য খোঁজা হচ্ছে। তখন আমেরিকার সরকার আইনস্টাইনকে আশ্রয় দিয়েছিল। গোপন এবং সুরক্ষিত স্থানে রাখা হয়েছিল আইনস্টাইনকে।
তো আইনস্টাইন শেষ বয়সে আসার পর কয়েকজন আমেরিকান বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এত বুদ্ধিমান একটা মস্তিস্ক এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে? তার মৃত্যুর পরও যদি তার মস্তিস্ককে জীবিত রাখা যেত, তাহলে সভ্যতা আরো দ্রত এগোত!

যাই হোক, সেই সময় প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে ড.হফম্যান নামে একজন সাইকায়াট্রিস্ট ছিলেন। তিনি দাবী করে বসলেন যে আত্মার অস্তিত্ব আছে! তিনি যেভাবে প্রমাণ করলেন সেটা এভাবে-
মানুষের কোষে মাইক্রোটিউবিউলসের কোয়ান্টাম দশা খুবই স্থির একটি দশা। মানুষ যখন মারা যায়, হৃৎপিন্ড যখন রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়, তখন এই কোয়ান্টাম দশাও এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু মাইক্রোটিউবিউলসে কিছু তথ্য থাকে যেগুলো ধ্বংস হয় না, যেগুলো ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এই তথ্যগুলো মানুষের মৃত্যুর পর দেহের বাইরে আত্মা হিসেবে অবস্থান করে।
তিনি নাকি পরীক্ষা করে দেখেছেন যে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের মাইক্রোটিউবিউলস থেকে এসব তথ্য উধাও হয়ে যায় এবং কোন রোগী যদি অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় তাহলে এসব তথ্য আবার ফিরে আসে।

যাই হোক, তিনি আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে না পারলেও এ তত্ত্ব থেকে একদল জীনতত্ত্ববীদ একটা বিষয় আবিস্কার করে ফেললেন- সেটা হলো, তারা মাইক্রোটিউবিউলসের তথ্য দেহের ভিতরে এবং বাহিরে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হলেন। তাদের প্রথম গিনিপিগ কে ছিল জানেন? খোদ আইনস্টাইন!”
এ পর্যন্ত শুনে মারিয়ার্টি ঢোক গিললেন!

“হোয়াট? আইনস্টাইন নিজেই?”

“হ্যা,আইনস্টাইনের কোষের কোয়ান্টাম দশা নিয়ন্ত্রণ করে তাকে এক ধরণের “সুনিয়ন্ত্রিত কোমায়” নিয়ে যাওয়া হয়। এই বিশেষ কোয়ান্টাম দশায় শরীরে বয়সের ছাপ পড়ে না। এবং ভয়ংকর ব্যাপার কি জানেন? যদিও দুনিয়ার কাছে আইনস্টাইন মৃত, কিন্তু আসলে তিনি জীবিত! এবং আইনস্টাইন আর কেউ নয়, আপনি নিজে প্রফেসর মারিয়ার্টি!”

প্রায় লাফিয়ে উঠলেন মারিয়ার্টি চেয়ার থেকে!

“হ্যাভ ইউ লস্ট ইওর ফাকিং মাইন্ড মি. প্রেসিডেন্ট?”

“অবাক হবেন না মি. মারিয়ার্টি! প্রতি ৫০ বছর পর পর আপনাকে কোমা থেকে উঠানো হয়। আপনার মাইক্রোটিউবিউলসে আর্টিফিশিয়াল জেনেটিক ইনফর্মেশন প্রবেশ করানো হয়। নতুন পরিচয় দেওয়া হয় আপনাকে। প্রতিবার আপনি ব্রিলিয়ান্ট কিছু আবিস্কার করে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেন।”

প্রফেসর মারিয়ার্টি হা করে তাকিয়ে রইলেন। তার আইনস্টাইনের চতুর মস্তিস্কও এই মূহুর্তে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে!

(সমাপ্ত)

পুনশ্চঃ প্রফেসর মারিয়ার্টিকে এরপর আর কখনো দেখা যায়নি! তবে শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে তার অসমাপ্ত লেকচার শেষ করেছিলেন আরেক প্রফেসর এডামস স্টিভেনসন, ঠিক তার ৫০ বছর পর। এডামসের পরিচয়? সেটা আমার জানা নেই!

Source: http://www.somewhereinblog.net/blog/mmibappy/29900712

One Comment Add yours

  1. দূর্দান্ত সাই-ফাই, ভাল্লাগছে!

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s